পাঠ করা নিয়মিত লেখালেখিও ডিসলেক্সিয়াকদের জন্য কঠিন।
তাহলে কি বাদ্যযন্ত্রের নোটেশন পড়াও কঠিন? সংগীত শিক্ষায় যারা যুক্ত, তাঁদের এই প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। এই লেখায় দেখা হয়েছে, কীভাবে একটি লার্নিং ডিসএবিলিটি যেমন ডিসলেক্সিয়া, সংগীত ডিকোডিং কঠিন করে দেয়। পাশাপাশি ছাত্রদের সংগীত শেখানোর জন্য কিছু চটপটে কৌশলও থাকছে।
ডিসলেক্সিক সংগীতশিল্পীদের চ্যালেঞ্জ
ডিসলেক্সিক শিশুরা বাদ্যযন্ত্র শেখার সময় বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়:
- শীট মিউজিক সাইট-রিডিং
- তথ্য ডিকোডিং, যেমন সংগীত চিহ্ন
- গুছিয়ে রাখা আর মনোযোগ ধরে রাখা
- নির্দেশনা মনে রাখা
এই সমস্যাগুলো মানসিক স্বাস্থ্যের জটিলতায় গড়াতে পারে, যা লার্নিং ডিসএবিলিটিতে প্রায়ই দেখা যায়। যেমন, সংগীত পড়তে সমস্যা হলে কাউকে একটি পিস শিখতে অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগতে পারে। এতে আত্মবিশ্বাসে ধাক্কা লাগতে পারে।
তবে গবেষণায় দেখা যায়, সব দিকেই এই চ্যালেঞ্জ থাকে না। Psychology Today-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় এ বিষয়টি বিস্তারিতভাবে দেখা হয়েছে।
গবেষকরা একটি কনজারভেটরি থেকে ছাত্রদের নিয়ে দুটি গ্রুপ তৈরি করেন। একটিতে ছিল ডিসলেক্সিক শিক্ষার্থীরা, অন্যটিতে ছিল যাদের এ ধরনের সমস্যা নেই। এছাড়া কলেজ-বয়সী ডিসলেক্সিকদের নিয়েও একটি কন্ট্রোল গ্রুপ ছিল।
প্রতিটি গ্রুপকে একাধিক টেস্টে অংশ নিতে হয়। টেস্টগুলো মূলত মিউজিক রিডিং স্কিল আর অডিটরি স্কিল যাচাই করে।
গবেষকরা দেখেছেন, শ্রবণ পরীক্ষায় ডিসলেক্সিক শিক্ষার্থীরা অন্যদের মতোই ভালো করেছে। এ থেকে বোঝা যায়, ডিসলেক্সিয়া ফোনোলজিকাল সচেতনতা-তে সরাসরি প্রভাব ফেলে না।
ফোনোলজিকাল প্রসেসিং আর সচেতনতা কী?
এগুলো হলো ভাষার—এক্ষেত্রে সংগীতের—শব্দ ব্যবহার আর মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতা।
গবেষণায় দেখা যায়, এই দক্ষতা ডিসলেক্সিকদের মধ্যেও অন্যদের মতোই থাকে। মূল সমস্যাটা ধরা পড়ে সংগীত পড়ার পরীক্ষায়। তখন ডিসলেক্সিয়া-জনিত পড়াশোনার সমস্যাগুলো থেকেই যায়।
তবে, আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, সংগীত পড়ার অসুবিধাটা সবসময় মূল ডিসলেক্সিয়ার জন্য না-ও হতে পারে। ২০০০ সালে, নিউরোলজিস্ট নীল গর্ডন দেখান, যেসব মস্তিষ্ক অংশ সংগীত পড়ে, সেগুলো ভাষা পড়ার অংশের থেকে আলাদা।
তিনি একে ‘ডিসমিউসিয়া’ নাম দেন। যেমনিভাবে ডিসলেক্সিয়া আর ডিসক্যালকুলিয়া আলাদা, তেমনি সংগীত পড়ার জন্যও ভিন্ন ব্রেইন ফাংশন কাজ করে।
তাহলে বোঝা যায়, ডিসলেক্সিক শিক্ষার্থীরা সংগীত পড়তে হিমশিম খায়। তবে আরও গবেষণা জরুরি। কেবল স্বাভাবিক সংগীত অনুশীলনে এই সমস্যার পুরো সমাধান হয় না। তাই শিক্ষকদের বিকল্প পথ খুঁজে নিতে হবে।
ডিসলেক্সিক শিক্ষার্থীদের সংগীত শেখানোর কৌশল
সাধারণ সংগীত শেখানোর পদ্ধতি দুর্বল পাঠকদের পক্ষে সহায়ক নাও হতে পারে। নোট পড়ার সমস্যা থেকে একধরনের মিউজিক-ডিসলেক্সিয়া তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকরা কিছু ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারেন।
মাল্টি-সেন্সরি পদ্ধতি ব্যবহার করুন
সংগীত শেখানোর সময় সব ইন্দ্রিয়কে কাজে লাগানো যায়। যেমন, কোনো অংশে নির্দিষ্ট এক ধরনের শব্দ তুলতে হবে শিক্ষার্থীকে।
নোটেশনে সেই শব্দ চিনতে তারা ঝামেলায় পড়তে পারে।
শিক্ষক মুখে বলে বাজানোর শব্দ শোনাতে পারেন। একবার শব্দটা চেনার পর, শিক্ষার্থী নিজে বাজিয়ে সেটি মিলিয়ে নিতে পারে।
শ্রবণের পাশাপাশি, দৃষ্টি আর নড়াচড়াও কাজে লাগে। ছবি ব্যবহার করে বাজানোর কৌশল বোঝানো যায়। হাতের মুভমেন্টের গ্রুপ অনুশীলনও সংগীতে অংশ নিতে ডিসলেক্সিকদের সাহায্য করতে পারে।
ডিসলেক্সিয়া বোঝে এমন শিক্ষক নিন
ডিসলেক্সিয়া না বোঝা শিক্ষকরা এ ধরনের শিক্ষার্থী শেখাতে বেগ পেতে পারেন। তাঁরা শীট মিউজিকের সিকোয়েন্সিং-জনিত সমস্যা সহজে ধরতে পারবেন না। প্রয়োজনীয় উৎসাহও নাও দিতে পারেন।
ডিসলেক্সিয়া কী, কীভাবে সমস্যা তৈরি করে—এসব জানা খুব জরুরি।
তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিশেষ দক্ষতা থাকা একেবারেই জরুরি নয়।
শিক্ষকদের শুধু ডিসলেক্সিয়ার লক্ষণ আর শেখানোর কৌশলগুলো জানতে হবে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার ধরন মানিয়ে নিতেও এই জ্ঞান কাজে লাগবে।
রঙভিত্তিক পদ্ধতি চেষ্টা করুন
রঙ দিয়ে শীটে প্যাটার্ন দেখানো অনেক সহজ হয়।
যেমন, কোনো পিসে বারবার একই অংশ থাকলে, সেই অংশগুলো একই রঙে চিহ্নিত করলে শিক্ষার্থী সহজে বুঝতে পারে সে কোন জায়গায় আছে। ফলে বারবার নোট ডিকোড করতে হয় না।
শুনে শেখানোতে অভ্যস্ত করুন
Psychology Today-এ বলা আছে, ডিসলেক্সিয়া শ্রবণ দক্ষতায় বাধা দেয় না। মোটর দক্ষতাতেও নয়। নোট পড়াই প্রধান চ্যালেঞ্জ।
তাই অনেক ক্ষেত্রেই শীট মিউজিক একেবারে বাদ দেওয়া যেতে পারে।
শুনে শেখা মানে—শব্দ শুনে নোট আর ধরণ চেনা শেখা। ধৈর্য দরকার। খুব কম মানুষই প্রথম থেকেই কানে শুনে বাজাতে পারে। তবে সময় দিলে আর ইম্প্রোভাইজেশনের সুযোগ রাখলে ডিসলেক্সিক শিক্ষার্থীর জন্য এটা অনেক সহজ হতে পারে।
সঠিক বাদ্যযন্ত্র বাছুন
যত জটিল যন্ত্র, শেখার সময়ও তত বেশি। ডিসলেক্সিকদের জন্য এতে চাপ আরও বেড়ে যায়।
তাই শিক্ষকরা শিক্ষার্থীর জন্য তুলনামূলক সহজ যন্ত্র বেছে দিন। যেমন, ছোট কীবোর্ড দিয়ে পিয়ানো শেখা শুরু করা বা রেকর্ডার দিয়ে বাঁশি শেখার শুরু।
সহজ যন্ত্র থেকে শুরু করুন, দক্ষতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধাপে ধাপে এগিয়ে যান।
ডিসলেক্সিকদের সহায়ক—Speechify
উপরের কৌশলগুলো ডিসলেক্সিকদের সংগীত শেখাতে ভালোই সহায়তা করে।
Speechify এসব কৌশলের ধারণা মাথায় রেখে তৈরি।
Speechify একটি টেক্সট টু স্পিচ অ্যাপ, যেটি যেকোনো লেখা শুনিয়ে দেয়। ডিসলেক্সিক ছাত্রদের স্কুলের বাকি চাপ নিয়ে বেশি ভাবনা না করেই সংগীত শেখায় আনন্দ পেতে সাহায্য করতে পারে। পাশাপাশি শীট মিউজিক বোঝাতেও কিছুটা সহায়ক হতে পারে।
যদিও এটি সরাসরি সংগীত নোটেশন পড়তে পারে না, Speechify গান লেখার অংশ বুঝতে সাহায্য করে। কোনো গানে কথা থাকলে, Speechify ডিসলেক্সিকদের সেই গানের কথাগুলো পরিষ্কারভাবে শুনিয়ে দেয়।
অ্যাপটি iOS, macOS, Android আর Google Chrome-এ পাওয়া যায়। নানা ভাষাতেও আছে। আরও জানতে Speechify-কে ফ্রি ট্রাই করে দেখুন আপনার পরের মিউজিক ক্লাসে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
ডিসলেক্সিয়া থাকলে কি সংগীতে ভালো হওয়া যায়?
ডিসলেক্সিকরা সংগীতে দারুণ করতে পারে। বিশেষ শিক্ষণ কৌশলে তারা স্বল্পমেয়াদী পড়ার সমস্যাও অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে পারে।
ডিসলেক্সিকরা কি বেশি শিল্পীসুলভ?
কিছু গবেষণা, যেমন https://doi.org/10.1080/23311908.2016.1190309, দেখায় ডিসলেক্সিকরা অস্বাভাবিক ধরনের ধারণার সংমিশ্রণ খুঁজে পেতে পারে।
সংগীত নোটেও কি ডিসলেক্সিয়া হতে পারে?
নির্দিষ্ট কোনো ‘মিউজিকাল ডিসলেক্সিয়া’ নেই। তবে, ডিসলেক্সিয়া সংগীত নোট পড়া বেশ কঠিন করে তুলতে পারে।
ডিসলেক্সিকদের জন্য সংগীতের কিছু উপকারিতা কী?
বাদ্যযন্ত্র শেখা আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, সিকুয়েন্সিং আর মনোযোগের মতো চ্যালেঞ্জ সামলাতেও সাহায্য করে।
ডিসলেক্সিয়ারাদের ছন্দ বেশি ভালো?
ডিসলেক্সিকদের ছন্দ সাধারণের চেয়ে বেশি ভালো—এমন কোনো প্রমাণ এখনো নেই।

