বিশেষ শিক্ষায় কর্মরত শিক্ষকদের নানান ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। স্কুল থেকে পর্যাপ্ত সহায়তা না পাওয়া আর প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের নিয়ে অতিরিক্ত কাগজপত্রের ঝামেলা — দুটোই বড় সমস্যা।
এর সাথে থাকে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থা সামাল দেওয়ার দরকার, যা ঝামেলা আরও বাড়ায়। যেমন, অটিজম-এ থাকা শিক্ষার্থীদের চাহিদা একরকম, আবার ডিসলেক্সিয়া বা এডিএইচডি-তে থাকা শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন একেবারেই আলাদা।
এতসব চ্যালেঞ্জের মাঝেও শিক্ষক ও শিক্ষার্থী — দুজনের জন্যই সহায়ক প্রযুক্তি দারুণ উপকারী। এই লেখায় এমন পাঁচটি টুল তুলে ধরা হয়েছে, যা শেখার দুর্বলতা থাকা শিক্ষার্থীদের জীবনদক্ষতা গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
বিশেষ শিক্ষায় সহায়ক প্রযুক্তি
এই তালিকায় থাকা টুল সাধারণ শিক্ষায় খুব একটা দেখা যায় না। এগুলো মূলত বিশেষ ক্লাসের ইনডিভিজুয়াল এডুকেশন প্লান (IEP)-এ ব্যবহার করা হয়। চলুন কিছু বিশেষ শিক্ষা সহায়ক টুল দেখে নেওয়া যাক।
টেক্সট টু স্পিচ রিডার
সাধারণভাবে, টেক্সট টু স্পিচ (TTS) সফটওয়্যার বেশ সহজ। শিক্ষার্থী টেক্সট বক্সে লেখা কপি করে, আর সফটওয়্যার সেই লেখা পড়ে শোনায়।
এটি সাধারণ ভাষায় টেক্সট পড়ে শুনিয়ে শিক্ষার্থীর প্রয়োজন মেটায়। এতে পড়ার সমস্যা থাকাদের প্রচুর উপকার হয়; যেমন ডিসলেক্সিয়া থাকলে চোখে লেখা আঁকাবাঁকা মনে হলেও TTS ব্যবহার করলে বোঝা অনেক সহজ হয়।
আরও উন্নত পর্যায়ের টেক্সট টু স্পিচ বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীর ভাষাগত দক্ষতাও বাড়ায়। অনেক সফটওয়্যারেই বহু ভাষা থাকে — বিদেশি ভাষা শেখাতেও এগুলো বেশ কাজে লাগে।
টেক্সট টু স্পিচ দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্যও অত্যন্ত কার্যকর। ভিজ্যুয়াল ইম্পেয়ারড ছাত্রদের আর চোখ কুঁচকে কষ্ট করে পড়তে হয় না; টেক্সট শুনে তারা মূল কাজেই বেশি মনোযোগ দিতে পারে।
গ্রাফিক অর্গানাইজার
গ্রাফিক অর্গানাইজার হলো ভিজ্যুয়াল থিঙ্কিং টুল, যা বিশেষ শিক্ষায় বেশ প্রচলিত। এতে ক্লাসের শিক্ষার্থীরা যা ভাবছে, তা ছবি বা চিত্রের মাধ্যমে সাজিয়ে তুলতে পারে।
দৃশ্য দেখে শিখতে যাদের সুবিধা, যেমন ডিসলেক্সিয়া-সম্পন্ন শিক্ষার্থীরা, তারা ছবি ব্যবহার করে শেখার উপকরণ থেকে বেশি উপকার পায়। ফ্রি ভেক্টর আইকন - এগুলো ছোট ছোট কম্পিউটার ছবির মতো – ডাউনলোড করে ব্যবহার করলে তথ্যের মধ্যকার সম্পর্ক সহজে ধরতে পারবেন। মাইক্রোসফট অফিসের ক্লিপ আর্টও ব্যবহার করা যায় (এটি "পিকচার টুল" নামে পাওয়া যায়)। এগুলো এক ধরনের মানচিত্রের মতো কাজ করে, যা শিখতে সাহায্য করে।
অনেকেরই বিভিন্ন লার্নিং ডিজ্যাবিলিটি থাকে—তারা দেখলে তথ্য ধরতে পারে, কিন্তু শুধু লেখা দেখলে পারে না। গ্রাফিক অর্গানাইজার তাদের জন্য ঠিক সেই পরিবেশই তৈরি করে। যেসব পাবলিক স্কুলে বিশেষ শিক্ষা ক্লাস আছে, সেখানে অবশ্যই এগুলো ব্যবহার করে দেখতে পারেন।
ক্লাসে আপনি নানান ধরনের গ্রাফিক অর্গানাইজার ব্যবহার করতে পারেন:
- ভেন ডায়াগ্রাম
- কনসেপ্ট ম্যাপ
- ফ্লো চার্ট
- মাইন্ড ম্যাপ
ফিজেট ব্যবহারের উপকারিতা
শিক্ষকরা প্রায়ই শিক্ষার্থীদের অস্থির নড়াচড়া কমাতে চান, কিন্তু বিশেষ শিক্ষা ক্লাসে এই ফিজেটিং-ই কখনও কখনও কাজে লাগে।
কীভাবে?
শেখার সময় মস্তিষ্ককে সজাগ রাখা জরুরি। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন অনেকেই এতে কষ্ট পান — তাদের মস্তিষ্ক সজাগ হলেও সেই সজাগ ভাব ঠিকমতো ধরে রাখতে পারে না।
হালকা নড়াচড়া বা ইতস্তত নাড়া-চাড়া এতে সাহায্য করতে পারে।
ফিজেট শিক্ষার্থীকে শান্ত থাকতে এবং একই সাথে মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখতে সহায়তা করে। হাত-পা নাড়ানো, পায়ে টোকা দেওয়া — এ ধরনের ছোট ছোট নড়াচড়া ব্রেনকে সজাগ রাখে।
সংক্ষেপে, বিশেষ প্রয়োজনে থাকা শিশুদের কিছুটা ফিজেট করতে দিন। অবশ্যই সীমা থাকতে হবে — যেন এটি শেখার পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। মনে রাখবেন, সামান্য ফিজেট অনেককেই ক্লাসের সাথে জড়িয়ে রাখে।
এফএম লিসনিং সিস্টেম
ফ্রিকোয়েন্সি মড্যুলেশন (FM) লিসনিং সিস্টেম অডিটরি সমস্যা থাকাদের জন্য তৈরি। এগুলো শ্রেণিকক্ষে ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ কমায় এবং অনেক সময় শিক্ষকের কণ্ঠ বাড়িয়ে তোলে।
ফলে শিক্ষকের কণ্ঠটাই সবচেয়ে স্পষ্টভাবে শোনা যায়। শিক্ষার্থীরা মূলত সেটাই শোনে এবং স্বভাবতই বেশি মনোযোগী হয়।
ধারণাটা কিন্তু একেবারেই সহজ।
শিক্ষক ছোট একটি মাইক্রোফোন পরে কথা বলেন। শিক্ষার্থীরা কানে ছোট রিসিভার পরে, যেখানে শিক্ষকের কণ্ঠ সরাসরি পৌঁছে যায়। এতে তারা শিক্ষকের কথা আরও ভালোভাবে মনোযোগ দিয়ে শুনতে পারে।
এই সহায়ক প্রযুক্তি শ্রবণ সমস্যা, ভাষাগত সমস্যা এবং অটিজম স্পেকট্রামে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য খুবই উপকারী।
সিপ-অ্যান্ড-পাফ সিস্টেম
বিশেষ শিক্ষার অনেক শিক্ষার্থীর চলাফেরায় সমস্যা থাকে। কারও সূক্ষ্ম নড়াচড়ার (ফাইন মোটর স্কিল) ঘাটতি থাকে, আবার কেউ সম্পূর্ণ বা আংশিক প্যারালাইসিসে ভোগে।
সিপ-অ্যান্ড-পাফ সিস্টেম তাদের কথা ভেবেই বানানো; এতে তারা মুখ ব্যবহার করে কম্পিউটার ও অন্য ডিভাইস চালাতে পারে।
যেমন, শিক্ষার্থী মুখ দিয়ে কন্ট্রোলার নাড়াতে পারে, আর সিপ অথবা পাফ দিয়ে ন্যাভিগেশন আইকনে ক্লিক করতে পারে। এসব ডিভাইস দিয়ে স্মার্টফোন ও ট্যাবলেটও চালানো যায়।
কীবোর্ড-মাউসের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে সিপ-অ্যান্ড-পাফ সিস্টেম। শিক্ষার্থীর সিপ-পাফই সেখানে মাউস ক্লিকের কাজ করে। এর আগে যেমন বিভিন্ন বাটন টেনে, চেপে বা ছুঁয়ে কম্পিউটার চালানো যেত, এখন তার জায়গা নিচ্ছে এই নতুন ধরনের টুল।
স্পিচিফাই: ক্লাসরুমের জন্য টেক্সট টু স্পিচ রিডার
স্পিচ-ল্যাঙ্গুয়েজ সমস্যা থাকাদের জন্য টেক্সট টু স্পিচ অ্যাপ খুব দরকারি, তাই অনেকেই উপযোগী অ্যাপ খুঁজছেন। বাজারে অনেক অ্যাপ থাকলেও, বিশেষ শিক্ষা ক্লাসের জন্য স্পিচিফাই বেশ ব্যবহারবান্ধব ও কার্যকর ফিচার দেয়।
অ্যাপটি ব্যবহার করা যায় iOS, macOS ও Android-এ। এছাড়া Google Chrome এক্সটেনশনও রয়েছে।
স্পিচিফাই-তে নানা ধরনের ন্যারেটর ভয়েস আছে, যাতে শিক্ষার্থী নিজের পছন্দের কণ্ঠ বেছে নিতে পারে। ১৪টি ভাষায় টেক্সট পড়ার সুবিধা রয়েছে — ইংরেজি, স্প্যানিশ, ফরাসি, পর্তুগিজসহ।
স্পিচিফাই ব্যবহার করলে আপনার বিশেষ শিক্ষা টুলকিটে একটি দরকারি সফটওয়্যার যোগ হবে। সবচেয়ে ভালো দিক, আপনি আগে ফ্রি ট্রাই করে দেখে নিতে পারেন — আপনার ক্লাসের জন্য মানানসই কি না।
প্রশ্নোত্তর
ক্লাসে কোন কোন টুল ব্যবহার করা হয়?
শ্রেণিকক্ষে প্রচলিত সাধারণ টুলের পাশাপাশি বিশেষ শিক্ষার জন্য নির্দিষ্ট কিছু টুলও ব্যবহৃত হয়। এখানে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরি এমন পাঁচটি টুলের তালিকা দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ শিক্ষায় কী ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার হয়?
এই লেখায় বলা টুল ছাড়াও বিশেষ শিক্ষায় আরও অনেক ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় — গণিত সিমুলেটর, প্রুফরিডার ইত্যাদি।
শিক্ষামূলক টুল বলতে কী বোঝায়?
শিক্ষকদের শিক্ষার্থীদের শেখানো ও সহায়তার জন্য ব্যবহার করা যেকোনো উপকরন বা রিসোর্সই মূলত শিক্ষামূলক টুল।

