ইবন বতুতা বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত আরব অভিযাত্রী। তার অসাধারণ যাত্রা ও দুঃসাহসিক অভিজ্ঞতা—The Travels of Ibn Battuta-তে—শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অভিযাত্রী, গবেষক ও নানান পাঠককে মুগ্ধ করে আসছে।
এই প্রবন্ধে তার অবিশ্বাস্য ভ্রমণপথ তুলে ধরা হবে এবং পথে দেখা নানা সংস্কৃতি সম্পর্কে তার অনুভব ও মন্তব্য শোনা যাবে। পাশাপাশি এই অগ্রগামী ভ্রমণকারীর ঐতিহাসিক প্রভাবও আলোচনায় আসবে।
ইবন বতুতার ভ্রমণ ও বইয়ের অনুপ্রেরণা
ইবন বতুতার ভ্রমণ একটি তথ্যবহুল, আকর্ষণীয় ও জীবন্ত বিবরণ, যেখানে চৌদ্দ শতকের মরক্কোর এই পরিব্রাজক ও পণ্ডিতের সফরের গল্প বলা হয়েছে। এই বইয়ে তিনি তিনটি মহাদেশজুড়ে ৪০টিরও বেশি দেশ ভ্রমণের বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছেন, যা ১৩২৫ সালে মরক্কো থেকে শুরু হয়ে ১৩৫৪ সালে চীনে এসে থেমেছে।
ইবন বতুতার ভ্রমণ ২৯ বছরের দীর্ঘ যাত্রার বাঁকে-বাঁকে তার অভিজ্ঞতার মনোমুগ্ধকর বিবরণ দেয় এবং সে সময় দেখা নানান সংস্কৃতির পূর্ণাঙ্গ ছবি এঁকে ধরে।
বইটিতে তিনি তাঁর দেখা ভূমি, ঘটনা, রীতি-নীতি, ধর্ম, অর্থনীতি ও মানুষের বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। এসব সমাজ কিভাবে চলতো ও তাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য কী ছিল, তাও তিনি তুলে ধরেছেন।
প্রায় তিন দশকের ইতিহাসকে টানটান গল্পের ভঙ্গিতে সাজানোর পাশাপাশি, ইবন বতুতার ভ্রমণ বিভিন্ন অঞ্চলের সংস্কৃতি ও আইনব্যবস্থা নিয়ে তথ্য জানার জানালা খুলে দেয়। এতে ভিন্ন ভিন্ন স্থান ও মানুষের বৈচিত্র্য, সৌন্দর্য ও ঐশ্বর্য উঠে এসেছে—যা সাধারণত কেবল রাজনীতি-নির্ভর ইতিহাসে আড়ালেই থেকে যায়।
এটি পাঠকদের রাজনীতি, ধর্ম ও সামাজিক রীতিনীতির আলোকে প্রামাণ্য ইতিহাস দেখায়, যেখানে বাইরের পক্ষপাতদুষ্ট বা অগভীর বিবরণের ওপর নির্ভর করতে হয় না।
মরক্কো থেকে চীন—ইবন বতুতার ভ্রমণের পূর্ণ বিবরণ
ইবন বতুতা মূলত ১৪শ শতকে মুসলিম বিশ্বে তার দীর্ঘ ভ্রমণের জন্য বিখ্যাত, যা প্রায় তিন দশকজুড়ে বিস্তৃত ছিল। তাকে সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভ্রমণকারী ধরা হয়। এই ভ্রমণ নিয়ে তিনি ‘The Rihla’ নামে বইও লিখেছেন। তিনি মুসলিম বিশ্বে সুপরিচিত এক স্কলার পরিবারে জন্মেছিলেন, আর তাদের বংশ ছিল লেওয়াতা নামের বারবার গোত্রভুক্ত।
তার যাত্রা শুরু হয় ১৩২৫ সালে, নিজের শহর মরক্কোর ট্যাঞ্জিয়ার থেকে উত্তর আফ্রিকার দিকে, ইসলামের জ্ঞান অন্বেষণের সংকল্প নিয়ে। সাহারা পাড়ি দিয়ে তিনি তিউনিস, আলেকজান্দ্রিয়া ও মিসরের কায়রো সফর করেন। এরপর তিনি জেরুজালেম, দামেস্ক, মদিনা, বাগদাদ ও মক্কায় হজ পালন করেন। মক্কায় তিনি অনেক গুণী মুসলিম পণ্ডিতের সান্নিধ্য পান।
এরপর তিনি ইরাক ও পারস্য (বর্তমান ইরান) অঞ্চলে যান, প্রথমেই যান মঙ্গোল শাসিত অঞ্চল তাবরিজে। তিনি আফগানিস্তান ও উজবেকিস্তানেও ভ্রমণ করেন, সেখানে প্রথমবারের মতো গৃহচ্যুত গোষ্ঠীর তাঁবু কাছ থেকে দেখেন।
উজবেকিস্তান ছাড়ার পর তিনি আনাতোলিয়া, তারপর কনস্ট্যান্টিনোপল (বর্তমান ইস্তানবুল) ও ভোলগা নদীর তীরে ভ্রমণ করেন। সেখানে তিনি বাইজেন্টাইন স্থাপত্য দেখেন, পাশাপাশি ইসলামী স্থাপত্যের প্রতি নতুন করে টান অনুভব করেন, যা আগের ভ্রমণে দামেস্ক ও ফেজে তার নজর কেড়েছিল।
ইবন বতুতা তার সঙ্গীদের নিয়ে জিদ্দা থেকে সমুদ্রপথে যাত্রা শুরু করেন। লাল সাগর ঘেঁষে ইয়েমেনে পৌঁছান এবং আফ্রিকার পূর্ব উপকূল ধরে কিলওয়া (তানজানিয়া) সহ নানা প্রধান বাণিজ্যনগরে থামেন। পরে ওমান, হরমুজ ও দক্ষিণ পারস্য পাড়ি দিয়ে আরবে ফিরে আসেন এবং কিছুদিন আনাতোলিয়ায় কাটান। এই সফরে তিনি অগণিত বৈচিত্র্যময় মানুষ ও সংস্কৃতি দেখেন এবং সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চলের জীবন সম্পর্কে একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা পান।
১৩৩২–৩৩ সালে ইবন বতুতা সোনালী হোর্ড ও চগতাই খানের রাজ্যে ঘুরে আফগানিস্তান হয়ে ভারতে পৌঁছান। দিল্লিতে সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের আতিথ্যে তিনি প্রায় সাত বছর থাকেন। সেখানে তাঁর জ্ঞানের জন্য তাঁকে কাজি (বিচারক) হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।
১৩৪১ সালে দিল্লির রাজনৈতিক টানাপোড়েনে তিনি চীনের উদ্দেশে দেশত্যাগ করেন, তবে উপযুক্ত নাবিকের খোঁজে তাকে শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ ঘুরতে হয়। পরে সুমাত্রা হয়ে তিনি চীনের কুয়ানঝৌ বন্দরে পৌঁছান এবং এক বছর ধরে বেইজিং থেকে কুয়ানঝৌ পর্যন্ত নানা শহর ঘুরে দেখেন। এরপর তিনি ফেজ হয়ে মরক্কোতে ফিরে আসেন।
স্বল্প বিরতির পর ইবন বতুতা দক্ষিণে স্পেনের গ্রানাডা এবং পশ্চিম আফ্রিকার মালিতে গিয়ে মংসা সুলেমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি বাড়ি ফিরে এসে প্রায় ৩০ বছরের ভ্রমণস্মৃতি বই আকারে লিপিবদ্ধ করেন—‘A Gift to Those Who Contemplate the Wonders of Cities and the Marvels of Travelling’। তবে জনপরিচিত নাম ‘The Rihla’।
ইবন বতুতার অবিশ্বাস্য যাত্রা নিয়ে পরবর্তীতে আরও অনেক বই লেখা হয়েছে। এর মধ্যে Dunn Ross-এর ‘The Adventures of Ibn Battuta’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
Speechify অডিওবুক দিয়ে অন্বেষণধর্মী গল্প শুনুন
Speechify একটি আধুনিক অডিওবুক পরিষেবা, যেখানে পাবেন বিস্তৃত বইয়ের সংগ্রহ—চিরকালীন ক্লাসিক থেকে শুরু করে ইবন বতুতার মতো ভ্রমণকাহিনি। Speechify-তে এক সাবস্ক্রিপশনে যেকোনো সময়, যেকোনো জায়গা থেকে হাজারো অডিওবুক উপভোগ করতে পারবেন।
Speechify-তে ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা ব্যক্তিগতকৃত; নিজের পছন্দমতো লাইব্রেরি সাজাতে পারবেন। “Sleep Timer”-এর মতো ফিচার থাকার ফলে রাতে ঘুমের আগে শুনে রেখে সকালে আবার যেখানে থেমেছিলেন সেখান থেকেই শুরু করতে পারবেন। এছাড়া নোট বা ট্যাগ অ্যাপে যোগ করতে পারবেন, ফলে কোথায় থেমেছেন সব সময় মনে রাখতে পারবেন।
Speechify বিনামূল্যে ব্যবহার করে দেখুন এবং মুগ্ধকর গল্প শুনে কল্পনার নতুন দুয়ার খুলুন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
ইবন বতুতা কিভাবে বিশ্বে প্রভাব ফেলেছেন?
তার রচনাগুলো আরবি সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ এবং মধ্যযুগীয় বিশ্বের অমূল্য তথ্যভান্ডার।
ইবন বতুতা কি ব্ল্যাক ডেথ-এ আক্রান্ত হয়েছিলেন?
না, ইবন বতুতা ব্ল্যাক ডেথে আক্রান্ত হয়েছিলেন বলে কোনো প্রমাণ নেই।
ইবন বতুতা কি সর্বকালের সেরা অভিযাত্রী?
তিনি যে দুরত্ব অতিক্রম করেছেন এবং ভ্রমণের যে বিস্তারিত বিবরণ রেখে গেছেন, তার জন্য ইবন বতুতা নিঃসন্দেহে ‘শ্রেষ্ঠ অভিযাত্রী’দের কাতারে থাকবেন।
ইবন বতুতা আর কোন কোন অভিযাত্রীদের সাথে দেখা করেছিলেন?
ইবন বতুতা তার ভ্রমণে নানা মঙ্গোল শাসক, চাইনিজ ব্যবসায়ী ও আফ্রিকা-মধ্যপ্রাচ্যের সুলতানদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এছাড়া ভারত ও মধ্য এশিয়ার ব্যবসায়ী, খ্রিস্টান পুরোহিত, মুসলিম শাসক ও দাস ব্যবসায়ীদেরও তিনি কাছ থেকে দেখেছিলেন।
ইবন বতুতা কার সাথে ভ্রমণ করতেন?
শুরুতে তিনি একাই ভ্রমণ করতেন, পরে ধীরে ধীরে সেবক ও হারেম তার যাত্রাসঙ্গী হয়।

