- হোম
- পরিচিতি
হাই, আমি ক্লিফ ওয়েইটসম্যান।

আমি ডিসলেক্সিক।
তৃতীয় শ্রেণিতে গিয়ে জানতে পারি। ওটা ছিল আমার জীবনের সেরা দিনগুলোর একদিন।
ওর আগে, স্কুলে পড়ার ভান করতাম।
বই খুলে বসতাম, আঙুল দিয়ে শব্দ টেনে যেতাম, যেন কেউ (আমার পরিবার, শিক্ষক, বন্ধু, ভাইবোন) না ভাবে আমি বোকা বা অলস।
রিডিং সার্কেল ছিল আতঙ্কের।
একজন করে পড়ত। আর ধীরে ধীরে আমার পালা এগিয়ে আসত।
হাত ঘেমে যেত।
আমি হিসেব করতাম, আর যত্ন করে সময় মাপতাম। ঠিক আমার পালার আগ মুহূর্তে…
বাথরুমে লুকিয়ে যেতাম।
প্রতিবারই তাই করতাম।
সবাই ভাবত, আমার বোধহয় প্রসাবের সমস্যা আছে—বোকা ভাবার চেয়ে এটাই ভালো লাগত।
সবচেয়ে খারাপ লাগত বাবার জন্য। উনি ছিলেন আমার হিরো।
যার মতো হতে চাইতাম।
সবাই ওনাকে ভালোবাসত। আমিও ভালোবাসতাম। চাইতাম, আমার জন্য গর্ব করুক।
“ক্লিফ, এত অলস কেন? পড়তে শিখতে চাস না?”
“চাই! বুঝতে পারছো না কত চেষ্টা করছি?!” কেঁদে উঠলাম।
“না, বুঝতে পারছি না। প্রতিদিন ২ ঘন্টা ধরে তোকে পড়াই, সব প্রোগ্রাম কিনেছি। একবার মনোযোগ দে।”
“মনোযোগ দিই?! আমি তো সব সময়ই দিই।”
“না, দাস না। পাত্তা দাস না। এমনকি তোর বোনও পারে, ও তো মাত্র ৬।”
“কারণ ওকে আমি শিখিয়েছি! চাইনি ও একই কষ্ট পাক।”
সব নিয়ম জানি। কিন্তু কাজে লাগাতে গেলেই… কিছুই হয় না।”
আমি ঠিকই পড়ার স্বপ্ন দেখতাম।
ছোটবেলায় প্রেসিডেন্ট, বিজ্ঞানী বা পপস্টার হতে চাইতাম।
জানতাম, এগুলোর যেকোনোটা হতে গেলেই পড়তে পারা জরুরি।
সবসময় বাহুতে বই চেপে ঘুরতাম, ভাবতাম একদিন ঠিকই পড়তে পারব।
সবচেয়ে পড়তে চাইতাম হ্যারি পটার।
কিন্তু ২০ বার চেষ্টা করে লাইব্রেরিয়ান যখন ঘুম থেকে তুললেন (৩য় পাতায় মুখ গুঁজে ঘুমিয়ে পড়তাম) তখন হাল ছেড়ে দিলাম।
ভাগ্য ভালো, আমার বাবা হাল ছাড়েননি। কখনও না।
ছোটবেলায় বাবা খুব কষ্ট করতেন। প্রায়ই আমাদের সঙ্গে রাতের খাবার খেতে পারতেন না।
তবু শুধু এটা করার জন্য আগেভাগে বাসায় ফিরতেনঃ
বিছানায় বসে, গভীর কণ্ঠে খুব ধীরে ধীরে হ্যারি পটার পড়ে শোনাতেন। আমার চোখ জ্বলে উঠত। ভীষণ ভালো লাগত।
যখন বাবা বাসায় আসতে পারতেন না, তখন টেপে রেকর্ড করতেন হ্যারি পটার পড়ে। ঘুমাতে যেতাম সেই টেপ শুনে, বারবার শুনতাম বাবার কণ্ঠ।
দ্বিগুণ ভাগ্যবান, কারণ মা (মানে MamaBear) ছিলেন। তিনি খুব যত্নশীল, আবার গবেষণাতেও দারুণ।
একদিন, হাজার বার খোঁজা আর ১০০টা বই পড়ার পর “ডিসলেক্সিয়া” সম্পর্কে জানলেন—ভাবলেন, আমারও হতে পারে। পরীক্ষা করালেন। সত্যিই তাই, সাথে ছিল ADD।
জানলাম আমি ডিসলেক্সিক, তখন ৯ বছরের বাচ্চারা যেভাবে হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, ঠিক সেভাবে ফেললাম। “অবশেষে!” ভাবলাম, “আমি নষ্ট না, বোকা না, আর একদমই অলস নই!”
“দারুণ, এখন অন্তত জানি সমস্যার নাম কী, এবার সমাধান খুঁজি!”
একটা বাক্য পড়তে আমার যত শক্তি লাগে, অন্যদের মাথায় চার অঙ্কের ভাগ করতে তত লাগে। ৪৬২/৭=…
একটা অনুচ্ছেদেই ক্লান্ত হয়ে যেতাম (মানে ১০টা অঙ্ক সেরে ফেলা,)
একটা অধ্যায়? মনে হতো ৩০০টা অঙ্ক করে ফেলেছি।
“একটানা এক অধ্যায় শেষ” বলে কিছু ছিল না, তার আগেই শক্তি ফুরিয়ে যেত, ভুল করতে শুরু করতাম (বুঝতাম না) অধ্যায় শেষের অনেক আগে। অতিরিক্ত মানসিক চাপ হয়ে যেত।
কিন্তু শুনতে গেলে এতটা কষ্ট লাগে না।
আমার বাবা কিনে দিলেন হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য সোর্সরার’স স্টোন, জিম ডেইল-এর কণ্ঠে অডিওবুক।
২২ বার টানা শুনেছি।
লাইব্রেরিতে যে ৩ পৃষ্ঠায় ঘুমিয়ে পড়তাম, সেগুলো মুখস্থ হয়ে গেছে। পুরো প্রথম অধ্যায়ও। ১৩ বছর হয়ে গেছে।
শোনা থামাইনি। সিরিজের সবই শুনেছি। তারপর নর্নিয়া, লর্ড অব দ্য রিংস, গেম অব থ্রোনস, পিলার্স অব আর্থ, অ্যাটলাস শ্রাগড।
কোনো দিনই শোনা বন্ধ করিনি।
মনে হতো পিঠে বিশাল পাথর বাঁধা, যা আমাকে এগোতে দিত না। একেকটা বাক্য পড়ে যেন দিন কেটে যেত। এখন মনে হয় পিঠে ডানা গজিয়েছে।
শোনার গতি বাড়াতাম, ১x থেকে ১.২৫x, ১.৫x, ২x, ২.৫x। ধীরে ধীরে বাড়াতে বাড়াতে, সব শব্দ নিজের ভেতর গেঁথে নিতাম।
সাইকেলে স্কুলে যাওয়া, বাসায় ফেরার অপেক্ষা, ঘুমানোর আগে, ঘর পরিষ্কার, হাঁটা, এমনকি টয়লেট—সব সময়ই শুনতাম।
প্রতি সপ্তাহে ২টা অডিওবুক শেষ করতাম। বছরে ১০০টা। টানা ১২ বছর ধরে। কঠিন লাগত না, বরং এটাই ছিল দিনের সবচেয়ে প্রিয় সময়।
সব বইয়ের অডিওবুক থাকে না। উচ্চমাধ্যমিকের গ্রীষ্মের বই “মার্লি এন্ড মি”-র কোনো অডিওবুক ছিল না। গ্রীষ্মে মায়ের সঙ্গে তাঁর বিছানায় বসে, মা-ই পড়ে শুনাতেন।
স্কুলজীবনে প্রতিদিন এক পিরিয়ড স্পেশাল এড ক্লাসে কাটাতাম।
অনেক রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি। প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করলাম এমনভাবে, যা কেউ শেখাতে পারত না। নিজের পড়াশোনা আর এডজাস্টমেন্ট নিজেই গড়ে তুলেছি। যাকে পারি সাহায্য চেয়েছি, অভ্যাস খুঁজে দেখেছি।
স্কুলের প্রায় সব AP, অনার্স ক্লাস নিয়েছি, ৪.০+ GPA ছিল, আর লড়াই করেছি অনেক শিক্ষকের সঙ্গে, যারা ভাবতেন ডিসলেক্সিয়া নাকি “ভুল কথা”। পরে যেসব টুল আর কৌশল ব্যবহার করেছি, সেগুলোও দেখাবো।
কিছু অসাধারণ শিক্ষকও পেয়েছি, যারা অবিশ্বাস্যভাবে পাশে থেকেছেন।
অনেক কষ্টে (আর শিক্ষকদের রাজি করিয়ে) ব্রাউন ইউনিভার্সিটিতে সুযোগ পাই। সমস্যা হলো: আমার গ্রীষ্মের বইয়ের কোনো অডিওবুক নেই…।
একই অবস্থা স্কুলের আরও অনেক বই, হ্যান্ডআউট, পিডিএফ, মেইল, উইকিপিডিয়ার ক্ষেত্রেও—কিছুই শুনে পড়ার উপায় নেই।
তাই আবার মা'র পাশে, তাঁর বিছানায় বসতাম। তিনি আমার কলেজের বই পড়ে শোনাতেন। কিন্তু সবটা পড়িয়ে দেওয়ার মতো সময় তাঁর ছিল না।
ব্রাউনে উড়াল দেওয়ার আগের রাতেও বইয়ের দুই-তৃতীয়াংশই কেবল শেষ হয়েছে।
অন্য কোনো উপায় ছিল না, পুরনো টেক্সট-টু-স্পিচ কম্পিউটার দিয়ে বাকি বইটা রেকর্ড করলাম, প্লেনে বসে শুনলাম।
আর সেটা দারুণ কাজ করল!
নিজে নিজে কোড শেখা শুরু করলাম (ডিসলেক্সিক হয়েও কীভাবে পারলাম, তা নিয়েও পরে বলব) আর ওই সফটওয়্যারটাকে আরও ভালো করলাম।
তারপর পুরো কলেজজুড়ে ৪ বছর এই সিস্টেমটাই ঘষেমেজে উন্নত করেছি। ডেস্কে পড়ে হাঁপিয়ে না গিয়ে—দ্রুত ১৫টা পেইজের ছবি তুলে নিতাম, তারপর খেতে খেতে বা লংবোর্ডিং করতে করতে শুনতাম।
প্রতি সপ্তাহে ক্লাসের জন্য বরাদ্দ ১০০+ পৃষ্ঠা ট্রেন বা বাসে হ্যাকাথনে যাওয়ার পথে শুনে শেষ করতাম। মনে হতো, ক্লাসে একমাত্র আমিই সব পড়া সেরে রাখি।
আজ, মিলিয়নের বেশি মানুষ Speechify দিয়ে স্কুল আর কাজে নিজেরা অসাধারণভাবে এগিয়ে যেতে পারছেন।
মনে রেখো, নিজের শৈশবে তোমার যেরকম কাউকে দরকার ছিল, বড় হয়েও ঠিক সেরকম মানুষ হতে পারাটাই আসল। অন্তত আমার কাছে।
ভালোবাসা ❤
ক্লিফ ওয়েইটসম্যান
